দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যাকবলিত মানুষ দিন দিন হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। কারণ, বহু এলাকায় এখনো কোনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়নি। বানভাসি অসহায় মানুষের দিন কাটছে দুর্যোগময় পরিস্থিতির মধ্যে।অনেকের ঘরবাড়ি ভেসে গেছে। মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তারা। ডুবে গেছে ফসলি জমিও। এখন এসব বানভাসি মানুষের প্রয়োজন বিশুদ্ধ পানি আর ব্যাপক ত্রাণ সহযোগিতা। পানিবন্দি লাখ লাখ মানুষের এটাই এখন একমাত্র চাওয়া।
কিছু কিছু এলাকায় এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। দুর্ভোগের পাশাপাশি দুর্গত এলাকায় চলছে ত্রাণের জন্য হাহাকার। এ অবস্থায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে বানভাসিদের। ত্রাণের জন্য অসহায় মানুষ ধরণা দিচ্ছে জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদে উঠে এসেছে বন্যাদুর্গত মানুষের কষ্টের কথা।
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের দুর্গম ঝুনকার চরের কুলসুম (৩৭), রহিমা (৪০) ও মেহেরজান (৩৮) জানান, এই চরের ২২৭টি পরিবার গত ৭ দিন ধরে বুক সমান পানির মধ্যে চৌকি, মাচা ও নৌকার ওপর পরিবার নিয়ে দিন-রাত কাটাচ্ছেন। প্রস্তুতি না থাকায় খাদ্য সংকটে অনাহারে থাকতে হচ্ছে তাদের মধ্যে অনেক পরিবারকে। বন্যায় রান্না করতে অসুবিধা হওয়ায় যাদের সামর্থ্য আছে তারা একদিন রান্না করে তিনদিন ধরে খাচ্ছেন। গ্রামের নলকূপগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। বাধ্য হয়ে এসব এলাকার লোকজন নদ-নদীর পানি পান করছেন। এ ছাড়া এসব এলাকার বন্যাদুর্গতদের মাঝে এখনো কোনো ত্রাণসামগ্রী না পৌঁছানোয় অবর্ণনীয় কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন তারা।
সিরাজাগঞ্জ : সিরাজাগঞ্জে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন চরাঞ্চলের বানভাসি মানুষ। যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের হার্ড পয়েন্টের কাছে বিপৎসীমা অতিক্রান্ত করে চলেছে। সেই সঙ্গে জেলার অভ্যন্তরীণ নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। করতোয়া, ফুলজোড়, ইছামতি, বড়াইল নদী ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। এ অঞ্চলে পানি না কমায় দুর্ভোগ কমেনি বন্যাদুর্গতদের।
জেলার ৯টি উপজেলার ৮২টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫০টি ইউনিয়নে প্রায় ৫ শতাধিক গ্রাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। দুই লক্ষাধিক হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে ইতিমধ্যে। ফলে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রান্তিক কৃষকরা। নতুন নতুন এলাকার বন্যা প্লাবিত মানুষেরা বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি এবং খাদ্যের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এখনো বন্যা প্লাবিত হওয়ায় ঘরবাড়ি ফসলি জমি ও গোচারণ ভূমিতে পানি থাকায় গবাদিপশু নিয়ে বিপদে পড়েছে বানভাসি মানুষ।
এদিকে তাঁত সমৃদ্ধ বেলকুচি, চৌহালী, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়ায় অনেক তাঁত ডুবে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছে হাজারো তাঁত শ্রমিক। তারা অর্ধাহারে ও অনাহারে জীবনযাপন করছেন।
সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় পড়েছে দুর্গমচরঞ্চলের বন্যার্ত মানুষ। ঘরের টুঁই পর্যন্ত পানি ওঠায় মাচা করে থাকতে না পেরে আশ্রয়ের সন্ধানে অনত্র চলে যাচ্ছেন তারা। অনেকে নৌকার অভাবে কোথাও যেতে না পেরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চরেই অবস্থান করছেন। এসব এলাকায় এখনো কোনো ত্রাণ পৌঁছেনি। ত্রাণের অভাবে চরাঞ্চলের এসব মানুষের খাদ্যের অভাব প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।
বগুড়া : বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বাঁধের ওপর আশ্রয় নেয় কয়েক হাজার মানুষ। তবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শেষ আশ্রয়টিও হারানোর আশঙ্কায় চোখে অন্ধকার দেখছেন এসব মানুষ। বগুড়ায় বন্যা-পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে এখনো দুর্গতদের কাছে কোনো ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছেনি।
এদিকে আকস্মিক পানি বৃদ্ধিতে ধুনট উপজেলার ১৩টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। গ্রামগুলো হলো বৈশাখী, বথুয়ারভিটা, রাধানগর, শহড়াবাড়ী, শিমুলবাড়ী, কৈয়াগাড়ী, বানিয়াজান, কচুগাড়ী, নিউসারিয়াকান্দি, রঘুনাথপুর, ভুতবাড়ী, পুকুরিয়া ও আটাচর।
এসব গ্রামের কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। গবাদিপশুসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে কষ্টে দিনযাপন করছেন। অনেক পরিবার আবার পানিবন্দি ঘরের মধ্যেই বাঁশের চাটাই তৈরি করে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। সেখানে জ্বালানি, খাদ্য, বস্ত্র ও খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
জামালপুর : জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সেখানে কয়েক হাজার মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। কুলকান্দি ইউনিয়নের পাইলিং বাঁধ এলাকার ৮০ বছর পেরোনো কছর উদ্দিন বলেন, ‘সহালে একজনের কাছ থেইকে চাইয়ে নিয়া চাইড্ডে চিড়া খাইয়া আইছিলাম। হারাডা দিন গেলো এক সের চাইলও পাইলাম না। চারডে পয়সাও পাইলাম না।’
একই এলাকার সত্তরোর্ধ্ব ময়না বেগম বললেন, ‘হারাডা দিন বইয়া থাইকা কতো কারুবারু করলাম-একসের চাইলও পাইলাম না। এহন কুঠি যাই, কি খাই!’ কথাগুলো বলবার সময় তার দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রুধারা। শুধু কসর উদ্দিন কিংবা ময়না বেগম নয়, ইসলামপুর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের বন্যা দুর্গতদের অবস্থা সবারই এক রকম।
Post a Comment